বিশ্বজিৎ দাস হত্যাকাণ্ড

বিশ্বজিত
ছাত্রলীগ নেতাদের নির্দেশ ছিল ‘স্ট্যাব’ (কুপিয়ে জখম) করার। তাই প্রতিযোগিতা করে সবাই কুপিয়েছে। কে কার চেয়ে বেশি কোপাতে পারে- এমন মানসিকতা থেকে বিশ্বজিতের ওপর চাপাতি নিয়ে চড়াও হওয়ার এমন তথ্যই পুলিশকে দিচ্ছে গ্রেপ্তার হওয়া ছাত্রলীগকর্মীরা। গতকাল বিশ্বজিৎ হত্যা মামলাটি সূত্রাপুর থানা পুলিশের কাছ থেকে গোয়েন্দা পুলিশের হাতে হস্তান্তরের পর শাকিলকে আট দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়।
এদিকে অসমর্থিত সূত্রে জানা যায়, বিশ্বজিৎ দাস হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের মধ্যে যারা গ্রেপ্তার হয়নি, তারা রাজধানীতেই আত্মগোপন করে আছে। ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের কিছু শীর্ষ নেতাই তাদের বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। আশ্রয় যারা পায়নি, তারা রাজধানী ছেড়ে নিরাপদে বের হওয়ার চেষ্টা করছে। শাকিল ও শাওন দেশ ত্যাগের চেষ্টা করেছিল। ওই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ছাত্রলীগের নির্ভরযোগ্য সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে। সূত্রে জানা যায়, শনাক্ত হওয়াদের মধ্যে রাজন, ইমদাদ, লিমন, তাহসীন, আজিজুল, আল-আমিন ও ইউনুসকে হন্যে হয়ে খুঁজছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। রাজশাহীর এক ছাত্রশিবির নেতার ভাই তাহসীন বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডের পর শিবিরের আশ্রয়ে আছে।
এদিকে বিশ্বজিৎ হত্যা মামলার অন্যতম আসামি রফিকুল ইসলাম শাকিলকে আট দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে ডিবি পুলিশ। গতকাল তাকে মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করে রিমান্ড আবেদন করা হলে এ রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়। মামলায় এ পর্যন্ত ছয়জনকে আট দিনের করে রিমান্ডে নেওয়া হলো। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, শাকিলসহ অন্য আসামিরা বিশ্বজিৎকে চাপাতি ও ছুরি দিয়ে কোপানো এবং রড দিয়ে আঘাত করার কথা স্বীকার করছে। তবে তারা নিজেদের ‘আংশিক’ অপরাধী বলে দাবি করছে। তাদের বক্তব্য হচ্ছে- নেতাদের নির্দেশ থাকার কারণেই ককটেল নিক্ষেপকারী সন্দেহে বিশ্বজিতের ওপর হামলা চালানো হয়। এতে বিশ্বজিৎ মারা যাবে, তা তারা বুঝতে পারেনি। কেউ কেউ এ হত্যাকাণ্ডের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে।
অভিযুক্তরা আশ্রয়ে : ডিবি ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের একাধিক সূত্রে জানা যায়, গণমাধ্যমে ছবি প্রকাশের পর রফিকুল ইসলাম শাকিল, মাহফুজুর রহমান নাহিদ, নূরে আলম লিমন, ওবায়দুল কাদের তাহসীন, কিবরিয়া, সাইফুল ইসলাম, রাজন তালুকদার, আজিজুল হক, আল-আমিন, রাশেদুজ্জামান শাওন, ইউনুস আলী ও শিপলুসহ কয়েকজন গা ঢাকা দেয়। এসব অভিযুক্তদের মধ্যে শাকিল, নাহিদ, শাওন, সাইফুল, তাহসীনসহ কয়েকজনের বন্ধু ও স্বজনদের আটক করে পুলিশ। প্রথমে ঢাকায় পালিয়ে থাকলেও গ্রেপ্তার হওয়ার আশঙ্কায় রাজধানী ছাড়ে এসব অভিযুক্ত ছাত্রলীগকর্মী। তাদের মধ্যে শাওন ও শাকিল ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। চারজন গ্রেপ্তার হলেও তাহসীন ছাত্রশিবিরের আশ্রয়ে আছে বলে ধারণা ছাত্রলীগ নেতাদের। তাহসীনের বড় ভাই তাফসীরুল কাদের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিবিরের একটি হলের সভাপতি ছিলেন। বর্তমানে তিনি রাজধানীর জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। সূত্রে জানা যায়, রাজন, ইউনুস, লিমন, ইমদাদ, আজিজুল, আল-আমিনসহ কয়েকজন রাজধানীতেই গা ঢাকা দিয়ে আছে। ছাত্রলীগের নেতারা কয়েকজনকে ধরিয়ে দিলেও অভিযুক্তদের ব্যাপারে তাঁরা পুলিশকে খোঁজ দিতে পারছেন না। সূত্রে জানা যায়, ইমদাদ ও লিমন গত শুক্রবার পর্যন্ত রাজধানীতেই ছিল। ইউনুস পুরান ঢাকায় অবস্থান করে। শনিবারও তারা স্থান পরিবর্তন করেছে।
এ ব্যাপারে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সভাপতি শরিফুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, তারা অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের জন্যই পুলিশকে সহায়তা করছেন। শনাক্ত হওয়া অভিযুক্তদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলেও দাবি করেন তাঁরা।
আমাদের আদালত প্রতিবেদক জানান, গতকাল নতুন তদন্ত কর্মকর্তা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (দক্ষিণ) পরিদর্শক তাজুল ইসলাম মহানগর হাকিম এরফান উল্লাহর আদালতে শাকিলকে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ডের অনুমতি চান। আদালত আট দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
আবেদনে বলা হয়, গণমাধ্যমে প্রচারিত ছবিতে শাকিলকে চাপাতি দিয়ে বিশ্বজিৎকে কোপাতে দেখা গেছে। ওই ফুটেজের মাধ্যমেই তাকে শনাক্ত করা হয়। যে চাপাতি দিয়ে কোপানো হয়েছে, গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ পাশের ২ নম্বর গেটে অবস্থিত চায়ের দোকানের পাশ থেকে তার দেখানো মতেই উদ্ধার করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। এ ঘটনায় জড়িত অন্য আসামিদের নামও প্রকাশ করেছে সে। অপরাপর আসামিদের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য জেনে তাঁদের গ্রেপ্তার করতে এ আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।
ওরা যা বলে : গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, উদ্ধার করা চাপাতিটি শাকিলের। বিভিন্ন সময় মারামারিতে ওই চাপাতি সে ব্যবহার করত। গত ৯ ডিসেম্বর শাকিল, রাজন, লিমন, নাহিদ, তাহসীন, ইউনুসসহ কয়েকজনের হাতেই ধারালো অস্ত্র ছিল। রাস্তার পাশে এবং বিশ্বজিৎ যেখানে আশ্রয় নেয় দুই স্থানেই ১০-১২ জন বিশ্বজিৎকে বেশি আঘাত করে। বাকিরা রড দিয়ে আঘাত করে। ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো হয় তিন দফায়। শাকিল, নাহিদ, সাইফুল, কিবরিয়া ও শাওন দাবি করে জানায়- তারা হত্যার জন্য বিশ্বজিতের ওপর হামলা চালায়নি। নেতাদের নির্দেশ ছিল ‘স্ট্যাব’ (কুপিয়ে জখম) করার। তাই প্রতিযোগিতা করে সবাই কুপিয়েছে। এতে বিশ্বজিৎ মারা যাবে- এমনটি ধারণা করেনি বলে দাবি করে তারা।
গোয়েন্দা সূত্র মতে আসামিরা আরো বলেছে, বিশ্বজিতের মৃত্যুর পর জবির ছাত্রলীগের সভাপতি শরিফুল ইসলামের জন্মদিনের কেক কাটার অনুষ্ঠানেই তারা খবরটি পায়। তখন এটিকে তারা গুজব হিসেবেই ধরে নেয়। কারণ, জখম করার পরও বিশ্বজিতকে তারা দৌঁড়ে পালাতে দেখেছে। গ্রেপ্তারকৃত ছয়জনই নিজেদের ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী বলে দাবি করছে। তবে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রেপ্তারকৃতদের দেওয়া তথ্য ও বক্তব্যের মধ্যে অমিল দেখা গেছে। তাদের সঙ্গে কথা বলে বাকিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। হত্যার বর্ণানা সুনির্দিষ্ট হলে আজ-কালের মধ্যে আসামিদের কাছ থেকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও পাওয়া যেতে পারে বলে জানায় সূত্র।
আসামিদের গ্রেপ্তার এবং তদন্তের ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ডিবি পুলিশের উপকমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি দেখেই অনেক আসামিকে শনাক্ত করা গেছে। অন্যতম আসামিরা গ্রেপ্তার হয়েছে। বাকিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’ তদন্তের স্বার্থে আর কোনো বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি মনিরুল ইসলাম। গত ৯ ডিসেম্বর ১৮ দলের অবরোধের দিন বিশ্বজিৎকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

কালেরকণ্ঠ সোমবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১২, ৩ পৌষ ১৪১৯, ৩ সফর ১৪৩৪

Gallery | This entry was posted in Awami league and tagged , , , , . Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s